'বিডি ফ্রি প্রেস' বাংলাদেশের প্রথম সংবাদ সংযোগকারী ব্লগ

মূলপাতা চট্টগ্রাম 

চট্টগ্রামের নালায় ডুবে একের পর এক মৃত্যু, দায় কার?


প্রকাশের সময় :২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ৭:৪৩ : পূর্বাহ্ণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নালা নর্দমা ও খালগুলো যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। স্রোতে ভেসে এক সবজি বিক্রেতা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার একমাস না যেতেই আবার বলি হয়েছেন এক ভার্সিটি শিক্ষার্থী।

কিছুদিন পরপরই নালায় পড়ে প্রাণহানির সংবাদ—এ যেন চট্টগ্রামবাসীর জন্য নিত্য ঘটনা। গত ৩০শে জুন চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর ২ নম্বর গেইট এলাকায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নালায় পড়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

এরপর ২৫শে আগস্ট মুরাদপুর এলাকায় নালার পানিতে পড়ে তলিয়ে যান সালেহ আহমদ নামে এক দোকানি। গেল একমাসেও তার কোনো হদিস মেলেনি।

ঠিক এক মাস ব্যবধানে সোমবার রাতে আগ্রাবাদে নালায় পড়ে সেহরিন মাহবুব সাদিয়া নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী নিখোঁজ হন। প্রায় ৫ ঘণ্টা তল্লাশি শেষে এই শিক্ষার্থীর লাশের সন্ধান পাওয়া যায়।

সোমবার রাত ৩টা ১০ মিনিটে ওই ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত শিক্ষার্থী সেহরিন মাহবুব সাদিয়া হালিশহর থানার বড়পুল মইন্যাপাড়া শুক্কুর মেম্বারের বাড়ির মোহাম্মদ আলীর মেয়ে।

দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় সাদিয়া চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল।

জানা গেছে, মেহেরীন মাহবুব সাদিয়া (২০) নানা ও মামার সঙ্গে চশমা কিনতে হালিশহরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।

চশমা কিনে ফেরার পথে আগ্রাবাদের শেখ মুজিব সড়কের নবী টাওয়ারের পাশের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন সত্তরোর্ধ্ব নানা হাজি জামালের হাত ধরে। পাশেই ছিল নালা। আচমকা পা পিছলে পড়ে যান নালায়।

মুহূর্তে নানা চিৎকার করে ওঠেন—সাদিয়া পড়ে গেছে। পাশে থাকা মামা জাকির হোসেন নালায় ঝাঁপ দেন ভাগ্নিকে উদ্ধারে।

কিন্তু নালায় প্রবল স্রোত থাকায় সব চেষ্টা বিফল হয়। নালার পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়ে যান সাদিয়া।

এই দুর্ঘটনার খবর পৌঁছে গেলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস। তারপর শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান। রাত ১০টার পর শুরু হওয়া উদ্ধার অভিযান শেষ হয় রাত ৩টার কিছু সময় পর।

কাদা-মাটি ও আবর্জনার স্তূপ থেকে সাদিয়ার নিথর দেহ বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০ ফুট দূরে গভীরে নালায় আবর্জনার মধ্যে আটকে ছিলেন সাদিয়ার দেহ। প্রায় ৫ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনের দু’টি ক্রেন দিয়ে প্রায় এক টন আবর্জনা অপসারণের পর মিলে তার নিষ্প্রাণ দেহের সন্ধান।

নিহত সাদিয়ার বাবা মোহাম্মদ আলী হালিশহর বড়পোল এলাকার বাসিন্দা। দুই ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়।  গতকাল মঙ্গলবার সকালে বড়পোল এলাকায় জানাজা শেষে সাদিয়াকে দাফন করা হয়েছে। এ সময় পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

এই বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক নিউটন দাশ বলেন, রাত ১০টার দিকে সাদিয়া নামে এক তরুণী নালায় পড়ে যায়। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় ৫ ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান শেষে আমরা তার মৃতদেহ উদ্ধার করি।

এদিকে দিন দিন নগরবাসীর কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এইসব নালা ও খাল। নালায় পড়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। সবমিলিয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা এইসব অরক্ষিত নালায় পড়ে সর্বশেষ ৩ মাসে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মারা যাওয়াদের ২ জন নারী।

জানা যায়, জলাবদ্ধতার নিরসন প্রকল্পের আওতায় নগরের নালা ও খালগুলোর সংস্কার কাজ চলছে। চলতি বছরের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে এখনো।

মুরাদপুর এলাকায় নালার পানিতে পড়ে তলিয়ে যান সালেহ আহমদ

কাজের সুবিধার জন্য খুলে ফেলা হয়েছে নালার ঢাকনা। ইতিমধ্যে অধিকাংশ নালার সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে।

তবে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সেখানে এখনো ঢাকনা তথা পাটাতনগুলো বসানো হয়নি। অনেক পাটাতন ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে বলে জানা যায়।

পাশাপাশি খালগুলোর পাশে নিরাপত্তা দেয়াল দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যার ফলে ড্রেন ও খালগুলো এখন পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে নাগরিকদের মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে ওঠেছে।

এদিকে এইসব নালা ও খাল অরক্ষিত রাখার দায়ভার নিতে নারাজ এখানকার দুইটি প্রধান সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

সিটি করপোরেশন বলছে, এইসব নালা ও খালের যে সংস্কার কাজ চলছে তার নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। আর সিডিএ বলছে, সংস্কার কাজ চালাচ্ছে সিটি করপোরেশন। তাই নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বও তাদের।

সিডিএকে দোষারোপ মেয়রের

মেয়রচট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র (চসিক) এম রেজাউল করিম চৌধুরী মন্তব্য করেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অবহেলায় নালায় ডুবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সেহেরিন সাদিয়া মাহবুবের (২০) মৃত্যু হয়েছে ।

মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে নগরের আগ্রাবাদ মোড় এলাকার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।

চসিক মেয়র বলেন, বর্তমানে দেওয়ানহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ বাস্তবায়ন করছে সিডিএ।

উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় সড়কটির যাবতীয় বিষয় দেখভাল করার দায়িত্বও সিডিএর। চসিকের এখানে তেমন কাজ নেই। সিডিএর অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, এ এলাকায় ফুটপাত আছে মাত্র দেড় ফুট। এতো ছোটো জায়গা দিয়ে হাঁটতে গেলে দিনের বেলাও তো মানুষ পড়ে যাবে। রাতে মেয়েটি পা পিছলে পড়ে গেছে।

সিডিএ চাইলে কিছু একটা দিয়ে নালাটা চিহ্নিত করে দিতে পারতো। এভাবে দিলে হয়তো দুর্ঘটনাও ঘটতো না। জনগণের জন্য উন্নয়ন। জীবন রক্ষা করতে না পারলে কিসের উন্নয়ন? যে সংস্থা উন্নয়ন করুক না কেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে।

সিটি করপোরেশন যেখানে যেখানে কাজ করছে সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও জানান চসিক মেয়র।

উল্লেখ্য, নগরে জলাবদ্ধতার সময় গত ছয় বছরে নালা-নর্দমা ও খালে পড়ে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন মারা যান চলিত বছরে।


মতামত দিন

আরও খবর