সোমবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

BDFreePress.com Is A Bangladeshi News Blog

মূলপাতা বিশেষ সংবাদ

বস্তি, গ্রাম, গরিব করোনা সর্বত্র: শেষ মুহূর্তের শনাক্তকরণে গ্রামাঞ্চলে বাড়ছে মৃত্যুহার


প্রকাশের সময় :৬ জুলাই, ২০২১ ২:১৪ : অপরাহ্ণ

করোনাবাংলাদেশেও করোনার শুরু থেকে নানা রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। করোনাকে অস্বীকার করতে চান অনেকে। এ কারণেই উপসর্গ নিয়ে একেবারে মূমুর্ষূ অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ায় দেশের গ্রামীণ জনপদে করোনায় মৃত্যু বাড়ছে।

তবে, স্বীকার করে নেয়া ভালো করোনাভাইরাস সম্পর্কে এখনো আমরা অনেক কিছু জানি না। এটা নিয়ে কাজ চলছে সারা দুনিয়ায়। গবেষণাগারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

পাওয়া যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্য। তবে ভয়ঙ্কর এই ভাইরাস ঘিরে দেশে দেশে তৈরি হয়েছে নানা গুজব। অন্ধ বিশ্বাসের কারণে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন অনেকে।

‘আমার করোনা হবে না’ এমন কথা বলতে শোনা যায় বহুমানুষকে। গ্রামে করোনা হয় না, বস্তিতে করোনা হয় না, গরিব মানুষের করোনা হয় না এমন নানা থিওরি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে এসবই মিথ্যা।

বরং এসব অন্ধ বিশ্বাসের কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছে মানুষ। অনেকে করোনা হওয়ার পরও স্বীকার করছেন না, নিচ্ছেন না চিকিৎসা। তারা হাসপাতালেও আসতে দেরি করছেন। যে কারণে দুর্গতি বাড়ছে।

বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন করোনা রোগীদের অর্ধেকের বেশি গ্রামের।

এদিকে, গ্রামাঞ্চলে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। সীমান্তবর্তী খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে মৃত্যুহার আশঙ্কাজনক।

কিন্তু এসব বিভাগের অধিকাংশ জেলাতে করোনা শনাক্তে নেই আরটি-পিসিআর টেস্টের ব্যবস্থা। কিছু জায়গায় জিন এক্সপার্ট ও র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে রোগী শনাক্ত হলেও তা অপ্রতুল।

ফলে টেস্ট করাতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের, আর উপসর্গ নিয়ে একেবারে মূমুর্ষূ অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ায় মৃত্যু বাড়ছে।

দেশে করোনাভাইরাস টেস্টের পরিধি বেড়েছে। এখন আরটি-পিসিআর, জিন এক্সপার্ট ও অ্যান্টিজেনসহ ৪২৭টি ল্যাবে কোভিড টেস্ট করা হয়।

দৈনিক টেস্টের সংখ্যা ৩০০০০-৩৫০০০ এর মধ্যে উঠানামা করছে।  টেস্টের সুযোগ মূলত শহরকেন্দ্রিক, বিশেষত ঢাকাকেন্দ্রিক।

কিন্তু এবারের ওয়েভে গ্রামেও রোগী বাড়ছে, গ্রামে টেস্টের অভাবে দ্রুত করোনা শনাক্ত করতে না পারায় মৃত্যুও বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গতকাল এ তথ্য জানান।

তিনি এটাও বলেছেন, “হাসপাতালে ভর্তি থাকা কোভিড-১৯ রোগীর ৫০% এরও বেশি গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছেন যেখানে মানুষেরা নিজেদের মহামারি থেকে নিরাপদ মনে করে”।

এসব রোগী শুরুতে হাসপাতালে আসছেন না। রোগের তীব্রতা অনেক বেশি হওয়ার পর তারা হাসপাতালে আসছেন।

এই রোগীরা এমন একটা পর্যায়ে হাসপাতালে আসছেন যখন ইতিমধ্যে তাদের দেহে করোনার তীব্রতা বেড়ে যায় বহুগুণ।

বৃষ্টির মৌসুম হওয়ায় অনেকেই তাদের করোনার উপসর্গকে মৌসুমী ফ্লু এর সাথে মিলিয়ে ফেলছেন।

ফলে তারা কোভিড-১৯ শনাক্ত পরীক্ষা কিংবা চিকিৎসা গ্রহণে নিরুৎসাহ বোধ করেন বলে জানান খুরশিদ আলম।

অন্যদিকে, বস্তিতে করোনা হয় না এমন একটি প্রচারণাও ছিল অনেকদিন ধরে। কিন্তু সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি’র এক গবেষণায় এটি ভুল প্রমাণিত হয়।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে বস্তি ও বস্তিসংলগ্ন এলাকার সোয়া তিন হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করে অধিকাংশের শরীরে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি পাওয়ার যায়।

এর মধ্যে ঢাকায় অ্যান্টিবডি পাওয়া যায় ৭১ শতাংশের নমুনায় এবং চট্টগ্রামে পাওয়া ৫৫ শতাংশ নমুনায়।

এরমানে হলো বস্তিবাসীদের এই অংশ কোনো না কোনো সময় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন অথবা করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছিলেন। এর ফলে তাদের শরীরে ওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বি’র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. রুবহানা রকীব এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন।

পরে ঢাকার একটি দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রথমেই বলেছি, প্রচলিত ধারণা ছিল বস্তিতে করোনা ছড়ায়নি। আমরা এই গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করলাম, বস্তিতে করোনা ছড়িয়েছে এবং সেখানে মানুষের মধ্যে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে।

আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, রোগটি হওয়ার পেছনে কী কী কারণ কাজ করে। আমরা বেশ কিছু তথ্য নিয়েছিলাম।

যেমন তাঁদের মধ্যে স্থূলতা আছে কি না, তাদের ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রোগ আছে কি না, হাইপারটেনশনের ওষুধ খান কি না বা কিডনির সমস্যা আছে কি না।

আমরা দেখেছি, যাঁদের স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো ক্রনিক রোগ আছে, তাঁদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

এ চিত্র হাসপাতালে যেমন দেখা যায়, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা দেখেছি। আমরা আরও কিছু তথ্য নিয়েছি।

আমরা দেখেছি, যাঁদের ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের বা ঘন ঘন হাত ধোয়ার অভ্যাস আছে বা চোখেমুখে হাত দেয়ার অভ্যাস কম আছে, তাদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ১২৮টি আরটি-পিসিআর কেন্দ্রের মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৮৮টি। ঢাকার বাইরে ২৭টি জেলায় আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে টেস্টের ব্যবস্থা রয়েছে।

এছাড়া ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলার মধ্যে আরটি-পিসিআর টেস্টের ব্যবস্থা রয়েছে ৮টি জেলায়। খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে ৪টিতে টেস্টের সুযোগ রয়েছে। সিলেট বিভাগের ৩টি পরীক্ষাকেন্দ্রই সিলেট জেলায় অবস্থিত।

রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে রংপুর ও দিনাজপুরে পরীক্ষাকেন্দ্র আছে। বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার মধ্যে বরিশাল ও ভোলায় পরীক্ষাকেন্দ্র রয়েছে।

৪৮টি সেন্টারে জিন এক্সপার্ট পদ্ধতিতে কোভিড টেস্ট করা হয়। এর মধ্যে ১৭টি কেন্দ্রই ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এখন জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে আরটি-পিসিআর ল্যাব না থাকলেও অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হচ্ছে।

কিন্তু সে টেস্টও একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে করতে হয়, পাড়া মহল্লায় টেস্টের সুযোগ নেই।

ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বেশি হলেও টেস্ট কম করা হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৪০০২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে নমুনা টেস্ট করা হয়েছে ১৬,২৬৪টি ও চট্টগ্রামে ৪৮৮৮টি ।

অধিক সংক্রমিত বিভাগ রাজশাহীতে ৪২৩৩, খুলনায় ৪১২১, রংপুরে ১৯৭৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ১০০০ এর কম নমুনা পরীক্ষা হয়েছে।


মতামত দিন

আরও খবর