'বিডি ফ্রি প্রেস' বাংলাদেশের প্রথম সংবাদ সংযোগকারী ব্লগ

মূলপাতা চট্টগ্রাম 

চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি: ভয়াবহ অবস্থা, শহর থেকে গ্রামে তিনগুণ বেশি মৃত্যু!


প্রকাশের সময় :১২ জুলাই, ২০২১ ৩:৪৮ : অপরাহ্ণ

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টশয্যায় জায়গা না পেয়ে ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে। চিকিৎসা পেতে কী আকুতি রোগী আর স্বজনদের। জরুরি বিভাগের যেন দম ফেলারও জো নেই। এমন রোগীর চাপে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক, নার্সসহ হাসপাতালের কর্মীদের।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটের এ চিত্র গতকালের।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৪ঠা এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর পুরো মাসে যত রোগী শনাক্ত হয় সবাই ছিলেন মহানগরীর বাসিন্দা। ধীরে ধীরে মফস্বল এলাকায়ও করোনা শনাক্ত হতে থাকে।

এরমধ্যে মহানগরীর মতো সেখানে করোনায় কয়েকজনের মৃত্যুও হয়। তবে শহরের তুলনায় সেখানে মৃত্যু ও শনাক্তের হার ছিলো অনেক কম।

বছরের শেষ দিন পর্যন্ত এখানকার মোট শনাক্ত ও মৃত্যুর ১০ শতাংশের কম ছিলো মফস্বলে।

তবে এখন এই ব্যবধান কমতে কমতে সম্প্রতি গ্রামের মৃত্যুর সংখ্য শহরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর শনাক্তের ব্যবধানও অনেকটা কমে এক তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে।

জানা যায়, চলতি লকডাউন শুরুর দিন থেকে অর্থাৎ ১লা জুলাই থেকে শনিবার পর্যন্ত মোট ১১ দিনে চট্টগ্রামে ৬২৪৪ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। এরমধ্যে মফস্বলের আছে ২৩৫৬ জন।

শতকরা হিসেবে সেটি মোট শনাক্তের ৩৮ শতাংশ। আর এই ১১ দিনে মোট ৭০ মৃত্যুর মধ্যে ৪৭ জনই মফস্বলের। যেটি শহরের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি।

সিভিল সার্জন থেকে ১১ জুলাই ( শনিবার) প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘন্টায় চট্টগ্রামে ২০৮২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৭০৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে মহানগরীর ৪১৬ জন ও বাকি ২৯৩ জন মফস্বলের। আর এই সময়ে মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়। যেটি এপর্যন্ত চট্টগ্রামে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।

এই ১৪ জনের মধ্যে ৭ জন মফস্বল ও বাকি ৭ জন নগরের বাসিন্দা। এনিয়ে চট্টগ্রামে মোট ৬৫ হাজার ৮ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে ৫০ হাজার ১৩৪ জন নগরের।

বাকি ১৪ হাজার ৮ শত ৭৪ জন মফস্বলের বাসিন্দা। আর এপর্যন্ত করোনায় মারা যাওয়া ৭৭১ জনের ২৭৪ জনের মৃত্যু হয় গ্রামে।

জানা যায়, উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাটহাজারী উপজেলা। এখানে ১০ জুলাই পর্যন্ত ৩০৮৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। আর মারা গেছেন ৫৭ জন।

তবে এই করোনার সবচেয়ে কম প্রভাব পড়েছে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে। এখানে মোট ২৩১ জনের করোনা পজিটিভ হয়েছে। আর মারা গেছেন এ পর্যন্ত ৬ জন।

এদিকে উপজেলা পর্যায়ে করোনার শনাক্ত ও মৃত্যুর হার উভয়টা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলেও সেখানকার মানুষের মধ্যে তেমন কোন সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না।

হৈ হুল্লোড়, আড্ডাবাজি সব চলছে ঠিক আগের মতো।

শহর থেকে অনেকে গ্রামে চলে আসায় আড্ডা আগের চেয়েও বেড়েছে এখানে। করোনা পরিস্থিতির কারণে বিদেশ ফেরত প্রবাসীরা এক্ষেত্রে অনেকে এগিয়ে। অনেকটা অসচেতনভাবে তারা হৈ হুল্লোড়ে গ্রাম মাতিয়ে রাখছেন।

হাট-বাজারে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। কোরবানির গরু দেখতে এই পাড়া সেই পাড়া ঘুরছেন।

জানা যায়, চলমান লকডাউনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক কম। জেলার কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানকার অধিকাংশ দোকানপাট খোলা।

পুলিশ – ম্যাজিস্ট্রেট আসলে তারা দরজা বন্ধ করে সটকে পড়েন। একটু পর আবার ফিরে এসে আড্ডায় মাতছেন।

এদিকে বিভিন্ন উপজেলায় সর্দি-জ্বর ও কাঁশিতে আক্রান্ত রোগী আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু হাসপাতালের বিড়ম্বনার ভয়ে অনেকে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন না।

অনেকে সাধারণ জ্বর ভেবে নাপা- প্যারাসিটামল খেয়ে দায় সারছেন। অবস্থা বেগতিক হলেই পরে হাসপাতালে যাচ্ছেন।

গ্রামের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) এর চট্টগ্রাম সেক্রেটারি ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী  বলেন, গ্রামের মানুষ খুব কম সচেতন।

এখানকার বেশিরভাগ মানুষ মুখে মাস্ক পড়েন না। যার ফলে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। আর এদের অধিকাংশই লক্ষণ দেখা দিলেও নমুনা পরীক্ষা করেন না। যার ফলে সংক্রমণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় হাসপাতালে নেয়ার পরও অধিকাংশকে বাঁচানো যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পরও গ্রামের মানুষ অসচেতন রয়ে গেছে। কোন স্বাস্থ্যবিধিই তারা মানতে চান না। আক্রান্ত হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে করোনা পরীক্ষা করান।

তখন আর চিকিৎসকেরও তেমন কিছু করার থাকে না। আর ততোক্ষণে অনেকের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে।তাই সেখানে শনাক্তের হার ও মৃত্যুহার দুটোই তার বেশি।

তিনি বলেন, চলতি লকডাউনে শহরের অনেকই গ্রামে চলে এসেছেন। তাদের মাধ্যমে এখানকার অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন।

বিদেশ ফেরতদের একটি বড় অংশও গ্রামে থাকছেন। এখানে প্রশাসনের তৎপরতাও কম। সব মিলিয়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বাঁচতে হলে তাই এখনই গ্রামের দিকে সবাইকে নজর দিতে হবে। না হয় পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

চমেক হাসপাতালে জরুরি ছাড়া ভর্তি ও অপারেশন বন্ধ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের ভর্তি ও রুটিন অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

করোনা রোগীদের চিকিৎসা সম্প্রসারিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জরুরি রোগী ভর্তি ও অপারেশন চালু রাখার কথা বলা হয়েছে নির্দেশনায়।

সোমবার (১২ জুলাই) নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ন কবীর।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং চার দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক বলেন, হাসপাতালের করোনা ইউনিটে দিনদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিছুদিন আগেও যেখানে একশর কম রোগী ছিল, এখন সেখানে রোগীর সংখ্যা ২৮০ জনের ওপরে।

করোনা রোগীর সংখ্যা যেহেতু দিনদিন বাড়ছে, সাধারণ রোগীদের মধ্যে অতি জরুরি ছাড়া অন্যান্য রোগী ভর্তি সীমিত করতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

একইভাবে জরুরি অস্ত্রোপচার ছাড়া অন্যান্য রুটিন অস্ত্রোপচার আপাতত স্থগিত থাকবে।

তিনি বলেন, অন্য সাধারণ রোগীদের এই সময়ে হাসপাতালে অবস্থান করা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণ ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ কিছুটা কমাতে পারলে বিদ্যমান জনবল দিয়ে করোনা ইউনিটের চিকিৎসা সেবা আরো ভালোভাবে দেওয়া যাবে।

মূলত এ কারণেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১০ জুলাই (শনিবার) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ন কবীর স্বাক্ষরিত চার দফা অফিস আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান কোভিড-১৯ রোগীর ব্যবস্থাপনার জন্য চার দফা নির্দেশনা প্রতিপালন করার জন্য বলা হলো।

নির্দেশনাগুলো হলো- কেবলমাত্র জরুরি অপারেশন ছাড়া অন্যান্য রুটিন অপারেশন স্থগিত থাকবে। জরুরি রোগীদের ভর্তি করা হবে, তবে রুটিন ভর্তি বন্ধ থাকবে।

এরইমধ্যে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে যারা জরুরি নন (দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত) তাদের আপাতত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হবে এবং সব স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, নার্সিং কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের ডিউটিকালীন সময়ে মাস্ক পরিধান করা অত্যাবশ্যক।

সর্বশেষ তথ অনুযায়ী, সোমবার (১২ জুলাই) চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ২৮০ জন রোগী ভর্তি আছে। এছাড়া দশটি আইসিইউতেও রোগী ভর্তি আছে।


মতামত দিন

আরও খবর